বাংলাদেশে পেইরোনিজ ডিজিজ: উপসর্গ, ধাপ, কারণ ও ঝুঁকি
পেইরোনিজ ডিজিজ এমন একটি অবস্থা যেখানে লিঙ্গের ভেতরে শক্ত স্কার টিস্যু (প্লাক) তৈরি হয় এবং ধীরে ধীরে উত্থিত অবস্থায় লিঙ্গের স্বাভাবিক আকৃতি বদলে যায়। অনেক পুরুষ প্রথমে লক্ষ্য করেন যে লিঙ্গে আগে না থাকা একটি নতুন বাঁক তৈরি হয়েছে। অন্যদের ক্ষেত্রে লিঙ্গের কোনো একটি অংশ সরু হয়ে যাওয়া, ডেন্ট তৈরি হওয়া বা দৈর্ঘ্য কমে যাওয়া দেখা যায়। এসব পরিবর্তন erection-এ ব্যথা, অস্বস্তি, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি এবং যৌন জীবনে সমস্যার কারণ হতে পারে।
জন্মগত লিঙ্গের বাঁকের মতো এটি নয়—পেইরোনিজ ডিজিজ হঠাৎ শুরু হয়, সময়ের সাথে অগ্রসর হয়, এবং নতুন স্কার টিস্যুর সাথে সম্পর্কিত। ধারণা করা হয়, প্রতি ১০ জনে প্রায় ১ জন পুরুষের পেইরোনিজ ডিজিজ থাকতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশে যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে লজ্জা বা সংকোচের কারণে খুব কম মানুষই চিকিৎসা নেন।
পেইরোনিজ ডিজিজের ধাপ
চিকিৎসকেরা সাধারণত দুইটি ধাপ উল্লেখ করেন:
- ১. অ্যাকিউট ফেজ (Acute Phase)
এই ধাপটি প্রায় ১৮ মাস পর্যন্ত চলতে পারে। এ সময় স্কার টিস্যু তৈরি হতে শুরু করে, লিঙ্গের আকৃতি দ্রুত বদলে যায় এবং erection-এ ব্যথা বেশি দেখা যায়। কিছু পুরুষ ঢিলেঢালা (flaccid) অবস্থাতেও অস্বস্তি অনুভব করেন। - ২. ক্রনিক ফেজ (Chronic Phase)
এই ধাপে প্লাক স্থির হয়ে যায়। বাঁক সাধারণত আর বাড়ে না, ব্যথা কমে আসে, কিন্তু বিকৃতি স্থায়ী হয়ে যায়। অনেক পুরুষের ক্ষেত্রে এ সময় ইরেকটাইল ডিসফাংশন (ED) দেখা দিতে পারে। লিঙ্গের দৈর্ঘ্য বা প্রস্থ কমে যাওয়াও বেশি স্পষ্ট হয়।
পেইরোনিজ ডিজিজের উপসর্গ
উপসর্গ ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে, তবে সাধারণ লক্ষণগুলো হলো:
- ১. লিঙ্গ বাঁকা হয়ে যাওয়া (Penile Curvature)
উপরের দিকে প্লাক → লিঙ্গ ওপরে বাঁকে
নিচের দিকে প্লাক → নিচে বাঁকে
একপাশে প্লাক → লিঙ্গ একদিকে বাঁকে - ২. ‘আওয়ারগ্লাস’ বা বটলনেক সংকোচন
প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পুরুষ লিঙ্গের কোনো একটি অংশ হঠাৎ সরু হয়ে যাওয়া লক্ষ্য করেন, যা erection-এ আওয়ারগ্লাস আকার তৈরি করে। - ৩. ত্বকের নিচে কঠিন গাঁট (Hard Lumps)
প্লাক শক্ত, সমতল বা হাড়ের মতো অনুভূত হতে পারে। - ৪. ব্যথা বা ব্যথাযুক্ত ইরেকশন
বিশেষ করে অ্যাকিউট ধাপে ব্যথা খুব সাধারণ—হালকা অস্বস্তি থেকে তীক্ষ্ণ ব্যথা পর্যন্ত হতে পারে। - ৫. লিঙ্গের দৈর্ঘ্য বা প্রস্থ কমে যাওয়া
অনেক পুরুষের ক্ষেত্রে ০.৫–১.৫ সেমি পর্যন্ত দৈর্ঘ্য কমে যেতে পারে। - ৬. যৌনক্ষমতার সমস্যা
পেইরোনিজ ডিজিজে আক্রান্ত ৫৪% পুরুষ ED-এর সমস্যায় ভোগেন, যা শারীরিক পরিবর্তন বা মানসিক চাপে আরও খারাপ হতে পারে।
ইরেকটাইল ডিসফাংশন ও পেইরোনিজ ডিজিজ
স্কার টিস্যু erection-এর সময় লিঙ্গের ভেতরের কক্ষগুলোকে পুরোপুরি প্রসারিত হতে বাধা দেয়। ফলে:
- erection দুর্বল হয়
- firmness ধরে রাখা কঠিন হয়
- উত্তেজনার সময় ব্যথা হয়
- মানসিক চাপ ও আত্মবিশ্বাস কমে যায়
Viagra (sildenafil), Cialis (tadalafil), Levitra (vardenafil) ইত্যাদি ওষুধ অনেক ক্ষেত্রে সাহায্য করে, তবে প্লাক যদি বেশি শক্ত বা বড় হয়, ওষুধ সবসময় কার্যকর নাও হতে পারে। চিকিৎসা না নিলে মানসিক চাপ, হতাশা ও সম্পর্কের সমস্যার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
পেইরোনিজ ডিজিজের কারণ
একটি নির্দিষ্ট কারণ নেই, তবে কয়েকটি বিষয় এই রোগের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত:
- ১. লিঙ্গে আঘাত (Penile Trauma) — সবচেয়ে সাধারণ কারণ
যৌনসম্পর্কের সময় অজান্তে ছোট ছোট আঘাত টিউনিকা অ্যালবুজিনিয়া ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, ফলে স্কার টিস্যু তৈরি হয়। যাদের জেনেটিক প্রবণতা আছে, তাদের ঝুঁকি আরও বেশি।
তীব্র আঘাত বা penile fracture-এ আক্রান্ত ব্যক্তিদের পরবর্তীতে পেইরোনিজ ডিজিজ বা ED হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। - ২. কানেক্টিভ টিস্যুর রোগ (Connective Tissue Disorders)
যেসব পুরুষ সহজেই স্কার টিস্যু তৈরি করেন, যেমন:
Dupuytren’s contracture
Scleroderma
Plantar fasciitis
তাদের মধ্যে পেইরোনিজ ডিজিজ বেশি দেখা যায়। - ৩. অটোইমিউন রোগ (Autoimmune Diseases)
যেমন:
Psoriasis
Psoriatic arthritis
Rheumatoid arthritis
Lupus
Sjögren’s syndrome
এই রোগগুলোর সাথে পেইরোনিজের সম্পর্ক বেশি দেখা যায়।
পেইরোনিজ ডিজিজের ঝুঁকির কারণ
- বয়স
৪০–৭০ বছর বয়সীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। - ডায়াবেটিস
ডায়াবেটিসের কারণে প্রদাহ ও স্কারিং বেড়ে যায়। যাদের ডায়াবেটিসজনিত ED আছে তাদের ঝুঁকি আরও বেশি। - পারিবারিক ইতিহাস
আশেপাশের আত্মীয়দের মধ্যে এই রোগ থাকলে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। - ধূমপান
ধূমপান ঝুঁকি ৪–৭ গুণ পর্যন্ত বাড়ায়। - স্থূলতা
ওজন বেড়ে গেলে সিস্টেমিক ইনফ্লেমেশন বাড়ে, যা প্লাক তৈরির সম্ভাবনা বাড়ায়। - প্রস্টেট ক্যান্সারের চিকিৎসা
সার্জারির পর যৌন পরিবর্তনের কারণে পেইরোনিজের ঝুঁকি বাড়ে। - ইরেকটাইল ডিসফাংশন
আংশিক erection-এ যৌনসম্পর্ক করতে গেলে লিঙ্গ বাঁকে বা আঘাত পায়—যা প্লাক তৈরি সহজ করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পেইরোনিজ ডিজিজ
বাংলাদেশে রোগটি প্রায়ই বহু বছর ধরে অচিকিৎসিত থাকে। লজ্জা, ভুল ধারণা ও যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলতে সংকোচের কারণে অনেকেই সময়মতো চিকিৎসা নেন না। ডায়াবেটিস, স্থূলতা, ধূমপান ও মানসিক চাপ—বাংলাদেশি পুরুষদের মধ্যে এগুলো বেশি হওয়ায় ঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি।
পেইরোনিজ ডিজিজের জটিলতা
পেইরোনিজ শুধু শারীরিক সমস্যা নয়—এটি অনেক পুরুষের মানসিক স্বাস্থ্যে বড় প্রভাব ফেলে।
২০২৩ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, এক-তৃতীয়াংশের বেশি রোগীর প্লাকে ক্যালসিফিকেশন তৈরি হয়। তখন প্লাক হাড়ের মতো শক্ত হয়ে যায়, যা রোগীদের মধ্যে ভয় ও উদ্বেগ তৈরি করে।
গবেষণায় আরও দেখা যায়:
- ৮০% রোগী মানসিক চাপ অনুভব করেন
- ৪৮%–৬২% রোগী ডিপ্রেশনে ভোগেন
- অর্ধেকের বেশি রোগীর সম্পর্কের সমস্যার সৃষ্টি হয়
কিছু গবেষণা আরও দেখায়, পেইরোনিজ রোগীদের মধ্যে prostatitis, enlarged prostate, lower urinary tract সমস্যা, এবং কিছু ক্ষেত্রে পেটের ক্যান্সার বা testicular cancer-এর ঝুঁকি সামান্য বৃদ্ধি পেতে পারে।
পেইরোনিজ ডিজিজ কীভাবে নির্ণয় করা হয়?
কারণ অনেক পুরুষের লিঙ্গ স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা বাঁকা থাকে, তাই এ রোগ চিহ্নিত করা সবসময় সহজ নয়। অভিজ্ঞ ইউরোলজিস্টই প্রকৃত পার্থক্য সঠিকভাবে ধরতে পারেন।
চিকিৎসার সময় ডাক্তার জিজ্ঞেস করবেন:
- উপসর্গ কখন শুরু হয়েছে
- আকৃতি কীভাবে বদলেছে
- erection-এ ব্যথা আছে কি না
- যৌনক্ষমতায় কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না
শারীরিক পরীক্ষায় ডাক্তার স্কার টিস্যু বা প্লাক খুঁজে দেখেন।
প্রয়োজনে erection-এর সময় লিঙ্গের আকৃতি পরীক্ষা করা হয়, যা সাধারণত intracavernosal injection test দিয়ে করা হয়।
অনেক ক্ষেত্রে ultrasound করে রক্তপ্রবাহ, প্লাকের আকার এবং ক্যালসিফিকেশন আছে কি না বোঝা হয়।
পেইরোনিজ ডিজিজের চিকিৎসা
সব রোগীর চিকিৎসা দরকার হয় না। ব্যথা অনেক সময় নিজে থেকেই কমে আসে। তবে বাঁক বা বিকৃতি সাধারণত নিজে থেকে ঠিক হয় না।
চিকিৎসা বিবেচনা করা হয় যদি—
- যৌনসম্পর্ক অসম্ভব বা কষ্টকর হয়
- ED তৈরি হয়
- বিকৃতি মানসিক চাপ সৃষ্টি করে
- উপসর্গ দ্রুত বৃদ্ধি পায়
চিকিৎসার ধরন:
- Penile traction therapy
- Penile injections
- Oral medications and supplements
- Surgery
- Shockwave therapy
Penile Traction Therapy
নির্দিষ্ট সময় লিঙ্গ টেনে দীর্ঘায়িত করার মাধ্যমে প্লাকের টান কমানো হয়। অনেক গবেষণায় বাঁক কমা দেখা গেছে। কিছু উচ্চমানের গবেষণায় দীর্ঘতা বৃদ্ধি ও erection উন্নতির কথাও বলা হয়েছে।
Penile Injections
Collagenase (Xiaflex®)
একমাত্র FDA অনুমোদিত চিকিৎসা। প্লাকের কলাজেন ভেঙে curvature কমাতে সাহায্য করে।
Interferon
প্লাকের আকার ও ব্যথা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
Verapamil
কিছু ছোট গবেষণায় উপকার দেখা গেছে, কিন্তু বড় গবেষণায় প্রমাণ সীমিত।
Oral Medications and Supplements
শক্ত প্রমাণ কম, তবে কিছু ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায়:
- Potassium para-aminobenzoate → প্লাকের আকার কমাতে পারে
- Vitamin E → এখন আর কার্যকর হিসেবে বিবেচিত নয়
- Tamoxifen → গবেষণাগারে সম্ভাবনা দেখা গেছে
- Colchicine → প্রাথমিক ধাপে কিছু উপকার দেখা যায়
- Pentoxifylline → ক্যালসিফিকেশন ধীর করতে সহায়ক হতে পারে
সার্জারি
তীব্র বা কার্যকরী সমস্যা থাকলে করা হয়।
- Plaque incision/excision with grafting → ৬০°-এর বেশি বাঁকে ব্যবহার
- Plication → বিপরীত দিক ছোট করে লিঙ্গ সোজা করা
- Penile implant → পেইরোনিজ + তীব্র ED থাকলে সর্বোত্তম বিকল্প
Shockwave Therapy
কম তীব্রতার শকওয়েভ দিয়ে ব্যথা ও প্লাক নরম করার চেষ্টা করা হয়। গবেষণা সীমিত হলেও কিছু রোগীর উপকার হয়।
পেইরোনিজ ডিজিজ প্রতিরোধ করা যায় কি?
সম্পূর্ণরূপে রোধ করা ছ লেও কিছু বিষয় ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে—
- যৌনসম্পর্কের সময় পর্যাপ্ত লুব্রিকেশন ব্যবহার
- ED থাকলে আগে চিকিৎসা করা
- ধূমপান বন্ধ করা
- স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা
লিঙ্গে ব্যথা, আকৃতির পরিবর্তন বা আঘাত অনুভব করলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ।