
রেট্রোগ্রেড ইজাকুলেশন (Retrograde Ejaculation)
বেশিরভাগ পুরুষই এ বিষয়ে কথা বলতে চান না, কিন্তু বীর্যপাতজনিত সমস্যা আসলে অনেক বেশি সাধারণ। এগুলোর মধ্যে রয়েছে অকাল বীর্যপাত, বিলম্বিত বীর্যপাত, এবং অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত একটি অবস্থা — রেট্রোগ্রেড ইজাকুলেশন।
রেট্রোগ্রেড ইজাকুলেশন তখন ঘটে যখন বীর্যপতনের সময় বীর্য লিঙ্গের আগা দিয়ে বের না হয়ে মূত্রথলিতে ফিরে যায়। এটি সাধারণত বেদনাদায়ক নয় বা ক্ষতিকরও নয়, কিন্তু সন্তান ধারণে সমস্যা তৈরি করতে পারে — বিশেষত বাংলাদেশের এমন দম্পতিদের জন্য যারা সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।
অনেক সময় এই অবস্থা শারীরিক অস্বস্তি সৃষ্টি না করলেও এটি ডায়াবেটিস, স্নায়ু ক্ষতি, বা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নির্দেশ করতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এটি শারীরবৃত্তীয় গঠনগত ভিন্নতা বা পেলভিক সার্জারির পরবর্তী প্রভাব হিসেবেও দেখা যায়।
যদিও অনেকেই বিষয়টি উপেক্ষা করেন, রেট্রোগ্রেড ইজাকুলেশন সম্পর্কে সচেতনতা পুরুষের প্রজনন স্বাস্থ্য ও মানসিক আত্মবিশ্বাস দুইয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। এই গাইডে আমরা জানব — রেট্রোগ্রেড ইজাকুলেশন কী, কেন হয়, কতটা সাধারণ, এবং এর চিকিৎসা কীভাবে সম্ভব, বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে।
রেট্রোগ্রেড ইজাকুলেশন এমন একটি অবস্থা যেখানে বীর্য লিঙ্গ দিয়ে বের না হয়ে মূত্রথলিতে ফিরে যায়। এতে বীর্যপাতের পরিমাণ খুব কম বা একদমই দৃশ্যমান না থাকতে পারে, যাকে বলা হয় “ড্রাই অর্গাজম”।
সাধারণভাবে, বীর্য তৈরি হয় অণ্ডকোষের শুক্রাণু এবং সেমিনাল ভেসিকল ও প্রোস্টেট গ্রন্থির তরল মিশে। এগুলো ইউরেথ্রা দিয়ে বেরিয়ে আসে — যা একই সাথে প্রস্রাবের পথ হিসেবেও কাজ করে।
অর্গাজমের সময় ব্লাডার নেক (Bladder Neck) নামে একটি পেশী স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায় যাতে বীর্য মূত্রথলিতে ফিরে না যায়। কিন্তু রেট্রোগ্রেড ইজাকুলেশনে এই পেশীটি ঠিকভাবে বন্ধ হয় না, ফলে বীর্য মূত্রথলিতে চলে যায়।
অর্গাজমের অনুভূতি স্বাভাবিক থাকলেও বীর্য প্রস্রাবের সাথে বেরিয়ে যায়, যা অনেক ক্ষেত্রেই বন্ধ্যাত্বের কারণ হতে পারে, যদিও শুক্রাণু উৎপাদন ঠিক থাকে।
রেট্রোগ্রেড ইজাকুলেশন কতটা সাধারণ?
রেট্রোগ্রেড ইজাকুলেশন তুলনামূলকভাবে বিরল, তবে অনেক ক্ষেত্রেই এটি চিকিৎসা না নেওয়ার কারণে শনাক্ত হয় না। বিশ্বজুড়ে গবেষণায় দেখা গেছে, এটি প্রায় দুই শতাংশ পুরুষের মধ্যে দেখা যায়, বিশেষত যারা ফার্টিলিটি ক্লিনিক এ যান।
বাংলাদেশে, এই অবস্থা সাধারণত দেখা যায় দীর্ঘমেয়াদি ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে, অথবা যারা প্রোস্টেট বা ব্লাডার সার্জারি করিয়েছেন। এটি রক্তচাপ, ডিপ্রেশন, বা প্রোস্টেট বৃদ্ধির ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেও ঘটতে পারে।
যদিও এটি শারীরিকভাবে ক্ষতিকর নয়, তবুও অনেকের জন্য এটি মানসিক চাপ তৈরি করে, বিশেষত যারা সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করছেন। সময়মতো ইউরোলজিস্টের পরামর্শ ও পরীক্ষা করলে বোঝা যায় এটি অস্থায়ী, ওষুধ-সংক্রান্ত, নাকি অন্য কোনও কারণের জন্য হচ্ছে।
রেট্রোগ্রেড ইজাকুলেশনের উপসর্গ
এই অবস্থায় প্রধান উপসর্গ হলো অর্গাজমের সময় বীর্যপাত না হওয়া বা খুব অল্প হওয়া। অনুভূতি থাকে স্বাভাবিক, কিন্তু বীর্য মূত্রথলিতে ফিরে যায়।
এটি ব্যথাহীন, এবং উত্তেজনা বা যৌন আনন্দে কোনও প্রভাব ফেলে না। সাধারণভাবে, পুরুষরা প্রতি বীর্যপাতে প্রায় এক চতুর্থাংশ থেকে এক চা চামচ বীর্য নির্গত করেন। রেট্রোগ্রেড ইজাকুলেশনে এই পরিমাণ খুব কম বা শূন্য হতে পারে।
বীর্য মূত্রের সাথে মিশে যাওয়ায় অর্গাজমের পর প্রস্রাব ঘোলা দেখাতে পারে। অনেকেই এই পরিবর্তনটি খেয়াল করেন না, তবে কেউ কেউ সন্তানধারণে ব্যর্থতা বা বীর্য কমে যাওয়ায় চিন্তিত বা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
রেট্রোগ্রেড ইজাকুলেশনের কারণ
রেট্রোগ্রেড ইজাকুলেশন ঘটে যখন ব্লাডার নেক পেশী সঠিকভাবে কাজ না করে এবং বীর্য মূত্রথলিতে ফিরে যায়। সাধারণত এই সমস্যা দেখা দেয় ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, সার্জারি, অথবা দীর্ঘস্থায়ী রোগের কারণে স্নায়ু ক্ষতির ফলে।
ওষুধের প্রভাব
বাংলাদেশে প্রচলিত কিছু ওষুধ রেট্রোগ্রেড ইজাকুলেশন ঘটাতে পারে, যেমন:
- আলফা-ব্লকারস — উচ্চ রক্তচাপ বা প্রোস্টেট বৃদ্ধির (BPH) চিকিৎসায় ব্যবহৃত। যেমন Tamsulosin বা Silodosin।
- অ্যান্টিডিপ্রেস্যান্টস — কিছু SNRI যেমন Venlafaxine (Effexor®) খুব বিরলভাবে বীর্যপাতের সমস্যা তৈরি করতে পারে।
- অ্যান্টিসাইকোটিকস — Risperidone, Clozapine, বা Thioridazine মাঝে মাঝে যৌন প্রতিক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে।
যদি নতুন কোনও ওষুধ শুরু করার পর উপসর্গ দেখা দেয়, নিজের থেকে ওষুধ বন্ধ না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সার্জারির প্রভাব
প্রোস্টেট, ব্লাডার বা পেলভিক অঞ্চলে সার্জারির পর এই সমস্যা দেখা দিতে পারে, যেমন:
- TURP বা HoLEP প্রোস্টেট সার্জারি — BPH চিকিৎসায় কার্যকর হলেও প্রায়ই বীর্যপাতে প্রভাব ফেলে।
- ব্লাডার বা ক্যান্সার সার্জারি — মূত্রথলি বা প্রজনন স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
- স্পাইন বা পেলভিক সার্জারি — কিছু ক্ষেত্রে স্নায়ু সংকেত ব্যাহত হয়, ফলে বীর্যপাতে সমস্যা হয়।
সার্জারির আগে ইউরোলজিস্টের সঙ্গে সম্ভাব্য যৌন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করা উচিত।
দীর্ঘস্থায়ী রোগ
কিছু দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা স্নায়ু বা পেশীর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করে, যেমন:
- ডায়াবেটিস (স্নায়ু ক্ষতি)
- মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস (MS)
- স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি বা স্ট্রোক
- জন্মগত গঠনগত ত্রুটি
বাংলাদেশে ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি রেট্রোগ্রেড ইজাকুলেশনের সবচেয়ে সাধারণ কারণ। নিয়মিত রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখলে ঝুঁকি কমানো যায়।
ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী (Risk Factors)
রেট্রোগ্রেড ইজাকুলেশন বিরল হলেও, ডায়াবেটিস রোগী এবং যারা প্রোস্টেট বা পেলভিক সার্জারি করিয়েছেন তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিসের কারণে স্নায়ু ক্ষতি (Diabetic Neuropathy) দ্রুত বাড়ছে, যা বীর্যপাতের স্নায়ু নিয়ন্ত্রণে সমস্যা তৈরি করে। ফলে বীর্য বাইরে না গিয়ে মূত্রথলিতে ফিরে যায়।
TURP বা HoLEP সার্জারি করা রোগীদের মধ্যে প্রায় ৭০–৯০% ক্ষেত্রে বীর্যপাতে পরিবর্তন দেখা যায়।
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ, অভিজ্ঞ সার্জনের পরামর্শ, এবং নিয়মিত ইউরোলজি ফলো-আপ ঝুঁকি অনেক কমিয়ে দেয়।
রেট্রোগ্রেড ইজাকুলেশনের নির্ণয় (Diagnosis)
ডায়াগনোসিস সাধারণত ইউরোলজিস্টের শারীরিক পরীক্ষা ও উপসর্গ বিশ্লেষণ দিয়ে শুরু হয়। যদি বীর্যপাতের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে কম বা অনুপস্থিত হয়, তাহলে বীর্য মূত্রথলিতে যাচ্ছে কি না তা পরীক্ষা করা হয়।
এই পরীক্ষাকে বলা হয় Post-Ejaculate Urinalysis। এতে অর্গাজমের পরপরই মূত্রের নমুনা সংগ্রহ করে মাইক্রোস্কোপে পরীক্ষা করা হয়। যদি প্রতি হাই-পাওয়ার ফিল্ডে (400x) পাঁচটি বা তার বেশি শুক্রাণু পাওয়া যায়, তাহলে এটি রেট্রোগ্রেড ইজাকুলেশন হিসেবে নিশ্চিত করা হয়।
বাংলাদেশের অ্যান্ড্রোলজি ও ফার্টিলিটি ক্লিনিকগুলোতে এই পরীক্ষা গোপনীয়ভাবে করা যায়, যা সঠিক কারণ নির্ণয় ও চিকিৎসা পরিকল্পনায় সহায়তা করে।
রেট্রোগ্রেড ইজাকুলেশনের চিকিৎসা (Treatment)
রেট্রোগ্রেড ইজাকুলেশনের চিকিৎসা নির্ভর করে এর মূল কারণের উপর। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সার্জারির প্রয়োজন হয় না, যদি না এটি বন্ধ্যাত্ব বা মানসিক চাপের কারণ হয়।
একজন ইউরোলজিস্ট প্রয়োজনে ওষুধ পরিবর্তন, নতুন প্রেসক্রিপশন, বা জীবনধারার পরিবর্তন পরামর্শ দিতে পারেন। সন্তান নেওয়ার ইচ্ছা থাকলে ফার্টিলিটি স্পেশালিস্টের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
ওষুধ পরিবর্তন
যদি আলফা-ব্লকার বা অ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট শুরু করার পর উপসর্গ দেখা দেয়, ডোজ কমানো বা ওষুধ পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রায়ই স্বাভাবিক বীর্যপাত ফিরে আসে।
সহায়ক ওষুধ
যদিও কোনও ওষুধ আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত নয়, কিছু ওষুধ ব্লাডার নেক পেশী শক্তিশালী করে উপসর্গ হ্রাস করতে পারে, যেমন:
- Imipramine
- Pseudoephedrine
- Antihistamines (যেমন Chlorpheniramine)
- Phenylephrine
এসব ওষুধ অবশ্যই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে নিতে হবে, কারণ এগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে।
অন্তর্নিহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ
যদি ডায়াবেটিস বা অন্য কোনও দীর্ঘমেয়াদি রোগ কারণ হয়, তবে চিকিৎসার লক্ষ্য থাকবে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ ও স্নায়ু রক্ষা করা।
সার্জারি
খুব কম ক্ষেত্রে ব্লাডার নেকের কার্যকারিতা উন্নত করতে সার্জারি করা হয়, তবে এর ফলাফল সীমিত। বাংলাদেশে বেশিরভাগ ইউরোলজিস্ট প্রথমেই অসার্জিক চিকিৎসা বেছে নেন।
বন্ধ্যাত্বের সমাধান (Fertility Treatment)
যেসব পুরুষ সন্তান নিতে চান, তারা ফার্টিলিটি ট্রিটমেন্ট নিতে পারেন। সাধারণ বিকল্পগুলো হলো:
- IUI বা IVF – স্বাভাবিকভাবে সংগৃহীত বীর্য ব্যবহার করে
- IUI বা IVF – প্রস্রাব থেকে সংগৃহীত শুক্রাণু ব্যবহার করে
- IVF – অণ্ডকোষ থেকে সার্জারির মাধ্যমে সংগৃহীত শুক্রাণু দিয়ে
একজন ফার্টিলিটি স্পেশালিস্ট বা রিপ্রোডাকটিভ ইউরোলজিস্ট পরিস্থিতি অনুযায়ী সঠিক পদ্ধতি নির্ধারণ করেন।
প্রতিরোধ (Prevention)
প্রতিরোধ নির্ভর করে কারণের উপর। টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে কিছু অভ্যাস ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে:
- ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা
- নিয়মিত শরীরচর্চা করা
- চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া
- তাজা ফল, শাকসবজি ও পূর্ণ শস্য খাওয়া
বাংলাদেশে ডায়াবেটিস ও প্রোস্টেট রোগের হার বাড়ছে, তাই প্রাথমিক চিকিৎসা ও ইজাকুলেশন-স্পেয়ারিং সার্জারি যৌন স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে অনেক প্রোস্টেট সার্জারি যৌন ক্রিয়া সংরক্ষণের লক্ষ্যেই ডিজাইন করা হয়েছে। প্রয়োজনে চিকিৎসকরা ইজাকুলেশন-স্পেয়ারিং TURP বা লেজার পদ্ধতি বেছে নিতে পারেন, যা বীর্যপাতে প্রভাব কম ফেলে।